ভেসে আসে বিলাপের ধ্বনি

Posted on July 13, 2011

0


আবুতোরাব উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে একজন অভিভাবককে কালোব্যাজ পরিয়ে দিচ্ছে একজন শিক্ষার্থী

আবুতোরাব উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে একজন অভিভাবককে কালোব্যাজ পরিয়ে দিচ্ছে একজন শিক্ষার্থী
ছবি: প্রথম আলো

চমৎকার অভিনয় করত শামসুদ্দিন। গতবার আবুতোরাব হাইস্কুলে রবীন্দ্রনাথের ‘ছুটি’ গল্প অবলম্বনে নাটক করেছিল শিক্ষার্থীরা। ওই নাটকে ফটিকের বিয়োগান্ত পরিণতি সেদিন অনেককেই অশ্রুসিক্ত করেছিল। আর এবার জীবনের মঞ্চ থেকেই চিরতরে ছুটি নিয়ে চলে গেল শামসুদ্দিন।
মিরসরাইয়ে দুর্ঘটনায় নিহত শামসুদ্দিনের বিদ্যালয়ে তার বন্ধুদের ওই নাটকের কথাই বারবার মনে পড়ছিল। কাঁদছিল তারা সান্ত্বনাহীন শোকে। প্রাণচঞ্চল ৩৫ জন সতীর্থের অকালমৃত্যুর শোক বিমূঢ় করে দিয়েছে তাদের। কচি প্রাণ শিক্ষার্থীদের এই মৃত্যুর কঠিন আঘাত সইতে না পেরে মূর্ছা গেছে কেউ কেউ।
স্কুলের মাঠে, পেছনে ও সামনের আবুতোরাব মধ্যম বাজার লোকে লোকারণ্য। মাতম আর আহাজারিতে এলাকা বিষাদময়। শোক সইতে না পেরে মূর্ছা যায় নবম শ্রেণীর ছাত্রী শাহেদা আক্তার, রোকসানা আক্তার, নাসরিন আক্তার, মনোয়ারা বেগমসহ কয়েকজন ছাত্রী। বিদ্যালয়ের নিচতলার একটি কক্ষে চলছিল তাদের শুশ্রূষা। কান্নায় ভেঙে পড়েছিল অনেকেই। ওদের সান্ত্বনা দিতে এসেছিলেন যাঁরা, তাঁরাও কোনো ভাষা খুঁজে পাননি, যাতে লাঘব হয় এই বেদনা।
বিদ্যালয়ের পেছনে পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে কান্না সামলে ওঠার চেষ্টা করছিল দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থী ফারজানা আক্তার। বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে সে বলল, ‘২১ জুলাই থেকে আমাদের প্রি-টেস্ট পরীক্ষা। পরীক্ষা নিয়ে ভয়ে ভয়ে ছিল শামসুদ্দিন। বলেছিল, ওকে যেন সাহায্য করি। এখন সে সব ভয় থেকেই অনেক দূরে।’
শামসুদ্দিনরা তিন ভাই এক বোন। বাবা সাখাওয়াত কৃষক। বাড়ি দক্ষিণ মগাদিয়ায়। পড়ালেখার সুবিধার জন্য মামার বাড়ি মায়ানীতে থাকত সে। শামসুদ্দিনের সঙ্গে খেলা দেখতে গিয়েছিল মামাতো ভাই শাখাওয়াতও। একই ঘরের দুই ছেলে নিহত হলো একসঙ্গে। শামসুদ্দিনের মা রহিমা বিলাপ করে বলছিলেন, ‘ও বাজান রে, বাজান, দইজ্জাকুলত্তুন ফোয়ারে হাঠাইছি পইড়বেরলাই, ভাইয়ের লগে স্কুলত যাইতো, ভাইয়ে লগে দুনিয়া ছাড়ি গেলগুই।’
দশম শ্রেণীর ছাত্র মেহেদী হাসানও খেলা দেখতে গিয়েছিল। সে ফিরছিল সাইকেলে। বলছিল তার বন্ধু আনন্দের কথা। নামের সঙ্গে বড়ই মিল ছিল ওর চরিত্রের। খুবই হাসিখুশি ছিল সে। মেহেদী বলল, ‘গতকালই (সোমবার) সে আমাদের বাদাম খাইয়েছিল। মজা করে বলছিল, “এই নে, এটি আমার স্মৃতি।” আমরা সবাই হাসাহাসি করেছিলাম ওর কথায়। দুষ্টুমি করতে গিয়ে বলা কথাটি যে এমন করে ফলবে, তা বিশ্বাসই হচ্ছে না।’ একটু আগেই সে যে বন্ধুদের সঙ্গে খেলা দেখেছে মাঠে, তাদের অনেকেই এখন আর নেই—এই বাস্তবতা হতবিহ্বল করে দিয়েছে তাকে।
মায়ানী ইউনিয়নের দাসপাড়া গ্রামে আনন্দের বাড়িতে পা রাখতেই তার নানি সুমতি রানী দাস বিলাপ করে ওঠেন, ‘ওরে, তোরা আঁর নাতিরে ফেরত আইনছতনি।’ কেঁদে কেঁদে অবসন্ন আনন্দের বৃদ্ধা দাদি বিপুলা রানী দাশ একচালা ঘরের সামনে একচিলতে উঠোনে পড়ে ছিলেন। ঘরের ভেতরে মা দীপালি রানী দাশ ঘন ঘন মূর্ছা যাচ্ছিলেন তিনি। আর বাবা তপন দাস সোমবার ছেলের মৃত্যুসংবাদ পেয়ে সেই যে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছেন, আর ফেরেননি। মনে হলো, এই কি তবে আনন্দের বাড়ি, এ বাড়ি তো বেদনার সাগর! শুধু আনন্দ আর শামসুদ্দিনের বাড়িতেই নয়, পুরো মায়ানী গ্রামটিই যেন ডুবে গেছে তাতে।
মায়ানীর পাশের ইউনিয়ন মগাদিয়া। সেখানে মাস্টারপাড়ার প্রফেসর বাড়ির দুই ভাইয়ের দুই শিক্ষার্থী নিহত হয়েছে। দুজনই তাদের বাবা-মায়ের একমাত্র ছেলে। ছেলেকে হারিয়ে বাড়ির সবাই কেঁদে কেঁদে এখন কান্নার শক্তিটুকুও যেন হারিয়ে ফেলেছে। একমাত্র ছেলে কলেজছাত্র ইফতেখার উদ্দিন মাহমুদকে হারিয়ে বাবা কামরুল হাসান বাক্রুদ্ধ। কামরুল হাসানের ভাই সাদরুল আমিন তাঁর ছেলে অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র তাকিউল্লাহ সাকিবের মৃত্যুসংবাদ পাওয়ার পর থেকে অচেতন হয়ে আছেন।
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী কামরুল হাসান চেয়েছিলেন, ছেলেকে বিবিএ পড়াবেন। সে কথা বলতে গিয়েই ডুকরে কেঁদে উঠে সোফা থেকে পড়ে গেলেন।
নিহত দুই ভাইয়ের চাচা চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ বদরুল হাসান বললেন, ‘কী বলে আমি ওদের সান্ত্বনা দেব। শুধু মনে মনে ভাবছি, এই মৃত্যু কি রোধ করা যেত না? এতগুলো প্রাণ অকালে ঝরে গেল, একটা গ্রাম মৃত্যুপুরীতে পরিণত হলো, এর জন্য কি কেউ দায়ী নয়? চালক কেন হেলপার (সহকারী) দিয়ে ট্রাক চালাবে? আবার হেলপার কেন চালানোর সময় মুঠোফোনে কথা বলবে? আমাদের সবখানে নিয়ম না মানার প্রতিযোগিতা। এসব বন্ধ হবে কবে?’
গ্রামের ঘরে ঘরে কান্নার রোল, কেউ শোকে পাথর, কেউ ভেঙে পড়েছে বিলাপে। কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা মহামারি নয়, শুধু চালকের খামখেয়ালিপনায় একটা এলাকা পরিণত হলো শোকের জনপদে।
মায়ানী ও মগাদিয়া ইউনিয়নের ঘরে ঘরে যখন কান্নার রোল, তখন আবুতোরাব হাইস্কুলে চলছিল সরকারি আমলা, মন্ত্রী, কর্মকর্তাদের আনুষ্ঠানিক শোক প্রকাশের তোড়জোড়। নিজের ৩৫ জন প্রিয় ছাত্রকে হারিয়ে শোক প্রকাশেরও যেন ভাষা পাচ্ছিলেন না প্রধান শিক্ষক জাফর সাদেক। তিনি স্থানীয় নেতা, আমলা, প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকর্তাকে সামলাতে হিমশিম খাচ্ছিলেন। কখনো কখনো ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিলেন। বললেন, ‘আমার সব মেধাবী ছাত্র আমাকে ছেড়ে চলে গেল। কাল কেন যে এমন করে সবাই খেলা দেখতে গেল?’
দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতেই আবুতোরাব বিদ্যালয়ের মাঠ শূন্য হয়ে যায়। সরকারি কর্মকর্তা, প্রশাসনের কর্তাব্যক্তি, সংবাদমাধ্যমকর্মী—সবাই ফিরে যান নিজ নিজ গন্তব্যে। তখনো এই জনপদ থেকে ভেসে আসছিল বিলাপের ধ্বনি।

Advertisements